ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য স্বস্তির খবর দিতে যাচ্ছে সরকার। নতুন অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বছরে প্রায় ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত বেতন বাবদ আয় করা ব্যক্তিদের আয়কর দিতে হবে না। কারণ বেতন আয়ের এক-তৃতীয়াংশ অংশ কর অব্যাহতির আওতায় থাকবে।
তবে করমুক্ত আয়সীমা বাড়লেও করদাতাদের সার্বিক করের চাপ খুব বেশি কমবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ বিনিয়োগে কর রেয়াতের সীমা কমানো, সঞ্চয়পত্র, সরকারি সিকিউরিটিজ এবং স্থায়ী আমানত (এফডিআর) থেকে কেটে নেওয়া উৎসে করকে চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য না করে অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে করদাতাদের পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ কর হিসাবের সময় অতিরিক্ত কর পরিশোধের প্রয়োজন হতে পারে।
সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছিল। তবে মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ আগের সীমার তুলনায় আরও ৫০ হাজার টাকা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পাবেন। বিশেষ করে যাদের প্রধান আয় বেতনভিত্তিক, তাদের একটি বড় অংশ করের আওতার বাইরে থাকবে।
এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক রাখার বিধান বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের ধারণা, এতে সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ বাড়বে এবং সঞ্চয় আরও বেশি আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আওতায় আসবে।
অন্যদিকে জমি ও ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য নিয়মিত করহার দিয়ে প্রদর্শনের যে সুযোগ প্রস্তাবিত বাজেটে রাখা হয়েছিল, সেটিও বাতিল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজার থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ আয়ের ওপর বিদ্যমান করহার অপরিবর্তিত থাকবে।
কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, করমুক্ত আয়সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়ানো অবশ্যই নিম্ন আয়ের করদাতাদের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে করের অন্যান্য কাঠামোয় পরিবর্তন না আনলে ব্যবসা, কৃষি, বাড়িভাড়া কিংবা অন্যান্য উৎস থেকে আয় করা ব্যক্তিদের করের বোঝা কমবে না। কারণ প্রস্তাবিত বাজেটে ন্যূনতম করহার ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদ থেকে কেটে নেওয়া উৎসে করকে আর চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। এটি অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য হবে। ফলে করদাতাদের চূড়ান্ত কর হিসাবের সময় অতিরিক্ত কর পরিশোধের প্রয়োজন হতে পারে।
এ ছাড়া বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের সীমা ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিনিয়োগ ধরে রাখার শর্ত যুক্ত হওয়ায় অনেক করদাতার ওপর অতিরিক্ত করের চাপ তৈরি হতে পারে বলেও মত দিয়েছেন তিনি।
এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে ১০ শতাংশ কর দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পরে সমালোচনার মুখে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই করহার ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার সেই সুযোগ পুরোপুরি বাতিল করে দেয়।
সব মিলিয়ে নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মাধ্যমে একদিকে নিম্ন আয়ের চাকরিজীবীরা করমুক্ত আয়ের সুবিধা পাবেন, অন্যদিকে কর কাঠামোর অন্যান্য পরিবর্তনের কারণে অনেক করদাতার জন্য নতুন হিসাব-নিকাশও তৈরি হতে পারে। ফলে চূড়ান্ত বাজেটে এসব প্রস্তাব কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়, সেদিকে নজর থাকবে করদাতা ও ব্যবসায়ী মহলের।
কসমিক ডেস্ক