অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশে ভারতের অর্থ সহায়তা গত এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ভারতের লোকসভায় উপস্থাপিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ২৫ কোটি রুপি অনুদানভিত্তিক সহায়তা। ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে শুরু করে গত ১২ বছরের হিসাবের সঙ্গে তুলনা করলে এটি সর্বনিম্ন পরিমাণ।
ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং লোকসভায় এক লিখিত উত্তরে বাংলাদেশকে দেওয়া এই সহায়তার তথ্য তুলে ধরেন। সেখানে ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোন বছরে কত অর্থ দেওয়া হয়েছে, তার বিবরণ দেওয়া হয়। ভারতের অর্থবছর এপ্রিল থেকে মার্চ পর্যন্ত গণনা করা হয়। সরকারি এই হিসাবে ভারতের লাইন অব ক্রেডিট বা এলওসির আওতাভুক্ত ঋণ সহায়তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি; বরং অনুদান ও সরাসরি উন্নয়ন সহায়তার চিত্রই এতে তুলে ধরা হয়েছে।
লোকসভায় দেওয়া তথ্য অনুসারে, গত এক যুগে ভারত বাংলাদেশকে মোট প্রায় ১ হাজার ৫৫৭ কোটি রুপি সহায়তা দিয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এই সহায়তার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯৮ কোটি রুপি। পরবর্তী বছরগুলোতে ওঠানামা থাকলেও একটি সময়ে এই সহায়তা ২০০ কোটির বেশি পর্যায়েও পৌঁছায়। সর্বোচ্চ সহায়তা আসে ২০২১-২২ অর্থবছরে, যখন বাংলাদেশকে দেওয়া হয় ২১৯ কোটি ৫৩ লাখ রুপি। কিন্তু এরপর থেকে সহায়তার প্রবাহ কমতে শুরু করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৫৯ কোটি রুপিতে, আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসে দাঁড়ায় মাত্র ২৫ কোটি রুপিতে। এই পরিমাণই গত ১২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এই পতনের প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সময়েই বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং পরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর বিভিন্ন ইস্যুতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েনের আলোচনা সামনে আসে। যদিও ভারতের সরকারি বিবৃতিতে বাংলাদেশকে ‘গভীর ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ’ প্রতিবেশী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবু অনুদান সহায়তার হ্রাস দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে শীতলতার ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এটি অবশ্য উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে একটি বিশ্লেষণাত্মক অনুমান; কারণ সহায়তা কমার সরাসরি একক কারণ লোকসভায় আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি।
ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিবেশীকেন্দ্রিক ও জনমুখী নীতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে এলওসি ও অনুদানের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ ত্রাণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচিতেও ভারত ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ ভারতীয় সহায়তা কেবল অবকাঠামো বা বড় উন্নয়ন প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সামাজিক ও মানবিক খাতেও বিস্তৃত ছিল।
তবে অনুদান সহায়তার পাশাপাশি এলওসি বা ঋণ সহায়তার বিষয়টিও বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ভারত ২০১০, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে তিনটি এলওসির মাধ্যমে বাংলাদেশকে মোট ৭৩৬ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু গত জানুয়ারি পর্যন্ত এর বিপরীতে ছাড় হয়েছে মোট ২১০ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রতিশ্রুত অর্থের তুলনায় ছাড়ের হার এখনও অনেক কম। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ খাতের বহু প্রকল্প এই ঋণ সহায়তার আওতায় নেওয়া হলেও অনেক প্রকল্প এখনও বাস্তবায়নাধীন বা প্রস্তাবনা পর্যায়ে রয়েছে। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, দ্বিপক্ষীয় সহায়তার বড় অংশ কাগজে প্রতিশ্রুত থাকলেও বাস্তব ছাড়ের গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর।
প্রথম এলওসির আওতায় নেওয়া ১৫টি প্রকল্পের মধ্যে ১২টি শেষ হয়েছে এবং ৩টি চলমান রয়েছে। দ্বিতীয় এলওসির ১৫টি প্রকল্পের মধ্যে ২টি শেষ, ১০টি চলমান এবং ৩টি প্রস্তাবনা পর্যায়ে। তৃতীয় এলওসির ১৩টি প্রকল্পের মধ্যে ৮টি চলমান এবং ৫টি এখনও প্রস্তাবনা পর্যায়ে রয়েছে। ফলে অনুদান সহায়তা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ঋণ সহায়তার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ভারতের লোকসভায় প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ভারতের অনুদানভিত্তিক অর্থ সহায়তা এখন এক যুগের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। অনুদানের পরিমাণ ২০০ কোটির বেশি থেকে নেমে ২৫ কোটি রুপিতে আসা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এলওসি প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব অর্থছাড়ের ব্যবধানও দেখাচ্ছে, বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক সহযোগিতায় কেবল ঘোষণাই নয়, বাস্তব অগ্রগতির প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কসমিক ডেস্ক