ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের ফলে ইউরোপের বাজারে ভারত শুল্ক সুবিধা পেতে যাচ্ছে। এর ফলে ইউরোপে ভারতীয় পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে প্রতিযোগিতা জোরদার করতে পারে।
প্রায় দুই দশকের আলোচনা শেষে গত মঙ্গলবার ইইউ–ভারত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়। ইউরোপীয় কাউন্সিল, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং ভারতের সংসদের অনুমোদন পেলে ২০২৭ সাল থেকে এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের বাজারে প্রবেশ করা অধিকাংশ ভারতীয় পণ্য বিশেষ শুল্ক সুবিধা পাবে।
এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ইউরোপে ভারতীয় পোশাকপণ্যের ওপর বিদ্যমান প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার হয়ে শূন্যে নেমে আসবে। একই সঙ্গে চামড়াজাত পণ্য, সামুদ্রিক পণ্য, হস্তশিল্প ও গয়নার মতো বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রেও শুল্ক কমানো বা সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়ার কথা রয়েছে।
ভারতের গণমাধ্যম জি নিউজ জানিয়েছে, এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির একটি বড় অংশ দখলের সম্ভাবনা দেখছে ভারত। বর্তমানে বাংলাদেশ ১৯৭৫ সাল থেকে এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা পেয়ে আসছে। এর ফলে ইইউতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। ডেনিম, ট্রাউজার ও টি-শার্টসহ কয়েকটি পণ্যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ইইউতে পোশাক রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় চীনের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। এরপর রয়েছে তুরস্ক, ভারত, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৫০ শতাংশের বেশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে গেছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় এক হাজার ৯৭১ কোটি ডলার।
ইইউর সঙ্গে চুক্তি সইয়ের পর ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল বলেন, ইউরোপে ভারতের টেক্সটাইল রপ্তানি দ্রুতই সাত বিলিয়ন ডলার থেকে ৩০ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী। তিনি উল্লেখ করেন, ইউরোপে বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে বড় বাজার দখলের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের আলোচনায় ছিল।
তবে বাংলাদেশের পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, প্রতিযোগিতা বাড়লেও তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে না। বিজিএমইএ পরিচালক ও সুরমা গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, উৎপাদন সক্ষমতা, দামের প্রতিযোগিতা ও কাজের মানের দিক থেকে বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় এখনও এগিয়ে রয়েছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ মূলত লো ও মিড রেঞ্জের পোশাক রপ্তানি করে, যেখানে ভারতের সঙ্গে পণ্যের সরাসরি প্রতিযোগিতা সীমিত। তবে নিট পোশাকের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি হতে পারে। প্রতিযোগিতা বাড়লে ইউরোপীয় ক্রেতাদের পক্ষ থেকে ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড়ের চাপ আসতে পারে বলেও তিনি মত দেন।
এই পরিস্থিতিতে খরচ কমানো, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং নীতিগত সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। তার মতে, ঋণের সুদহার কমানো, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সহায়ক নীতি প্রণয়ন করা গেলে সম্ভাব্য এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।