বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে যুক্ত হলো আরেকটি গৌরবময় অধ্যায়। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্বাদ পেল বাংলাদেশ। রাজধানীর মিরপুরে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ৫ উইকেটের জয় তুলে নিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ নিশ্চিত করে স্বাগতিকরা।
সিরিজ নির্ধারণী এই ম্যাচে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য ছিল বৃষ্টি-সংশোধিত ১৯২ রান। তবে রান তাড়ার শুরুটা মোটেও স্বস্তিদায়ক ছিল না। ইনিংসের একেবারে শুরুতেই ওপেনার তানজিদ হাসান তামিমকে হারিয়ে চাপে পড়ে যায় দল। দ্বিতীয় বলেই উইকেট হারানো বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে।
তবে সেই ধাক্কা সামলে দায়িত্বশীল ব্যাটিং উপহার দেন সৌম্য সরকার ও নাজমুল হোসেন শান্ত। দুজনই ধীরে ধীরে ইনিংস গড়ে তোলেন এবং দ্বিতীয় উইকেটে গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে দলের ভিত শক্ত করেন। তাদের ৮৬ রানের জুটি ম্যাচে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রাখে। ব্যক্তিগতভাবে দুজনই ৪২ রান করে আউট হন। একই স্কোরে দুই ব্যাটারের বিদায় ম্যাচে এক ভিন্ন দৃশ্যের জন্ম দেয়।
এরপর উইকেটরক্ষক ব্যাটার লিটন দাস ভালো শুরুর আভাস দিলেও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। ২১ রান করে ফিরে যান তিনি। প্রথম ম্যাচে দারুণ পারফরম্যান্স করা মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতও এদিন বেশিক্ষণ ক্রিজে থাকতে পারেননি। তিনি ১৫ রান করে সাজঘরে ফেরেন। ফলে মাঝপথে কিছুটা চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ।
তবে শেষ দিকে সেই চাপ আর বাড়তে দেননি তাওহিদ হৃদয় ও অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। দুজন মিলে ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ইনিংস এগিয়ে নেন। ষষ্ঠ উইকেটে তাদের অবিচ্ছিন্ন ৫১ রানের জুটি বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করে। হৃদয় ৪০ রানে অপরাজিত থাকেন, আর মিরাজ ২২ রান করে ম্যাচ শেষ করেন একটি ছক্কা হাঁকিয়ে। তাদের দৃঢ় ব্যাটিংয়ে ৩৬ বল হাতে রেখেই ৫ উইকেটের জয় পায় বাংলাদেশ।
তবে ম্যাচের ভিত্তি মূলত গড়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের বোলাররা। শুরু থেকেই অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে চাপে রাখেন পেসার তাসকিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমান। নতুন বলে তাদের নিয়ন্ত্রিত ও আক্রমণাত্মক বোলিংয়ে দ্রুত উইকেট হারাতে থাকে সফরকারীরা। রানের খাতা ভালোভাবে খোলার আগেই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি উইকেট হারিয়ে বড় বিপদে পড়ে অস্ট্রেলিয়া।
চাপের মুখে দলের হাল ধরেন মারনাস লাবুশানে ও জাভিয়ের বার্টলেট। সপ্তম উইকেটে তারা ১০৩ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে অস্ট্রেলিয়াকে লড়াই করার মতো অবস্থানে নিয়ে যান। বার্টলেট ৫২ রান করেন, আর লাবুশানে ৫৫ রানে অপরাজিত থাকেন। তাদের প্রতিরোধ না থাকলে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ আরও কম হতে পারত।
বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান ও তাসকিন আহমেদ। দুজনই ৩টি করে উইকেট শিকার করেন। বিশেষ করে মুস্তাফিজ তার বৈচিত্র্যময় বোলিং দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের বারবার সমস্যায় ফেলেন। ২৭ রান খরচ করে ৩ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখায় ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তার হাতে।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে শুধু একটি সিরিজ নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রিকেটে আত্মবিশ্বাসের নতুন বার্তাও যোগ হলো। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখিয়ে সিরিজ জয় প্রমাণ করেছে যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ এখন আরও পরিণত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে।
সিরিজের প্রথম ম্যাচেও বাংলাদেশ দাপুটে পারফরম্যান্স দেখিয়ে ৮৬ রানের বড় জয় পেয়েছিল। ফলে দ্বিতীয় ম্যাচ জিতেই সিরিজ নিজেদের করে নেওয়া সম্ভব হয়। এখন শেষ ম্যাচে জয় পেলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে স্মরণীয় হোয়াইটওয়াশের সুযোগও তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের সামনে।
সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডে অনুষ্ঠিত হবে ১৪ জুন মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। ক্রিকেটপ্রেমীদের দৃষ্টি এখন সেই ম্যাচের দিকে, যেখানে ইতিহাসের সঙ্গে আরও একটি অর্জন যোগ করার সুযোগ থাকবে টাইগারদের সামনে।
কসমিক ডেস্ক