দেশের অন্যতম খরাপ্রবণ এলাকা রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকট দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। Rajshahi জেলার তানোর, গোদাগাড়ী, মোহনপুর, পবা, বাগমারা ও দুর্গাপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষি, জনজীবন ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে Tanore Upazila এবং Godagari Upazila সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
নেদারল্যান্ডস-ভিত্তিক গবেষণা সাময়িকী Cleaner Water-এ প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণাটি রাজশাহীর ১৪টি উপজেলার তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিচালিত হয়েছে, যেখানে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং মানুষের পানি ব্যবহারের ধরণ নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, গত পাঁচ দশকে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত প্রায় ৩৪ শতাংশ কমে গেছে। ১৯৭৮ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে যেখানে গড় বৃষ্টিপাত ছিল ১,৪০৬ মিলিমিটার, সেখানে ২০১১ থেকে ২০২৪ সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯২৫ মিলিমিটারে। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১২ মিলিমিটার করে বৃষ্টিপাত কমছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের উঁচু ও শক্ত মাটিতে পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কম থাকায় এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার ফলে পুকুর, খাল ও অন্যান্য জলাশয় দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে কৃষিকাজে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বেড়ে গেছে। কিন্তু অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৩৫ বছরে রাজশাহীতে পানির স্তর প্রায় ৩ দশমিক ৭৮ মিটার নিচে নেমেছে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, কয়েক বছর আগেও যেখান থেকে সহজেই পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে অনেক গভীরে নেমেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সেচ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং কৃষি উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
এদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গবেষণা বলছে, শতাব্দীর শেষ নাগাদ এই অঞ্চলের তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং ২০৮৮ সালের মধ্যে তা প্রায় ৪৭ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে ৩৫ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা থাকা দিনের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু কৃষিতে নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনেও পড়ছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬১ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, পানির সংকটে তাদের আয় ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৯৫ শতাংশের বেশি মানুষ পানি সংগ্রহে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করছেন এবং প্রায় ৭৩ শতাংশ মানুষ পুরোপুরি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—পানি সাশ্রয়ী আধুনিক সেচ প্রযুক্তির ব্যবহার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, অতিরিক্ত পানি উত্তোলনে নিয়ন্ত্রণ এবং খরা-সহনশীল ফসলের চাষ বৃদ্ধি।
পরিবেশবিদদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করবে। এর প্রভাব পড়বে নিরাপদ পানীয় পানি, খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপর।
সব মিলিয়ে, বরেন্দ্র অঞ্চলের এই পানি সংকট একটি বড় পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত এই সংকট মোকাবিলা করা না হলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কসমিক ডেস্ক