দেশের সব নাগরিকের জন্য মানসম্মত ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা বৈষম্য কমিয়ে একটি সমতাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অংশের মানুষ এখনও গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করেন। কিন্তু জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হন। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে অন্যতম হলো দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ। এদের একটি বড় অংশ নারী স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে কাজ করবেন। তারা গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক চিকিৎসা সহায়তা এবং মা ও শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করবেন। এর মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৫০ শয্যার ৪৯২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে রোগীদের জন্য অধিক শয্যা, উন্নত চিকিৎসা সুবিধা এবং বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারি পরিকল্পনায় মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতক ও শিশুসেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে নিরাপদ মাতৃত্বসেবা ও শিশুস্বাস্থ্যের নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হবে এবং সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
শুধু উপজেলা নয়, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি বিভাগীয় শহরে শিশু বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ এবং বড় শহরগুলোতে নারীদের জন্য আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট, করোনারি কেয়ার ইউনিটসহ বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের গ্রামীণ এলাকায় কাজ করতে উৎসাহিত করার জন্য নিরাপদ আবাসন, পেশাগত উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের অভিমত, স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ এবং তৃণমূল পর্যায়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা গেলে শহর ও গ্রামের স্বাস্থ্য বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন হলে সাধারণ মানুষ নিজ এলাকার কাছাকাছি উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবে, ফলে রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসা নির্ভরতা কমবে এবং স্বাস্থ্যখাতে সেবার সমতা প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে।
কসমিক ডেস্ক