বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেলের মজুত এখনো তুলনামূলক নিরাপদ পর্যায়ে থাকলেও, নতুন করে সংকট দেখা দিচ্ছে পরিশোধিত জ্বালানি ও তেলজাত পণ্যে— এমন সতর্কতা দিয়েছে প্রভাবশালী বিনিয়োগ ব্যাংক Goldman Sachs। তাদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও মোট তেলের মজুত এখনো বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবে সহজে ব্যবহারযোগ্য পরিশোধিত পণ্যের সরবরাহ দ্রুত কমে আসছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেট ফুয়েল, ন্যাফথা এবং এলপিজির মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পণ্যের মজুত উদ্বেগজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এই পণ্যগুলো বিমান চলাচল, শিল্প উৎপাদন এবং রাসায়নিক খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এসব পরিশোধিত পণ্যের মজুত প্রায় ৪৫ দিনের চাহিদা পূরণের মতো রয়েছে, যা অস্থিরতা শুরুর আগে ছিল প্রায় ৫০ দিনের সমান।
অন্যদিকে, অপরিশোধিত তেলের মজুত এখনো প্রায় ১০১ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু সমস্যাটি হচ্ছে— এই তেল দ্রুত পরিশোধন করে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করা যাচ্ছে না। রিফাইনিং সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, বাণিজ্য বাধা এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর এবং ইউরোপের আমস্টারডাম-রটারডাম-অ্যান্টওয়ার্প হাব-এ ন্যাফথার মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে প্লাস্টিক ও রাসায়নিক শিল্পে।
চীন ছাড়া এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চল এবং ইউরোপের কিছু দেশ এই সংকটে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, থাইল্যান্ড ও তাইওয়ানও এর প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে বিমান চলাচল খাতে। জেট ফুয়েলের সংকটে অনেক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে বিভিন্ন এয়ারলাইনস। ইউরোপে জেট ফুয়েলের মজুত দ্রুত কমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে রয়েছে ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত। এই প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বেড়ে গেছে এবং তেলের ভবিষ্যৎ মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৩ ডলারের কাছাকাছি, আর West Texas Intermediate (WTI) crude প্রায় ১০৪ ডলারে লেনদেন হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল দ্রুত স্বাভাবিকও হয়ে যায়, তবুও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আগের অবস্থায় ফিরতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। ফলে সামনের দিনগুলোতে বিশ্ব অর্থনীতিতে এই সংকটের প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
কসমিক ডেস্ক