তীব্র গরমে হাতপাখার চাহিদা আকাশছোঁয়া The Daily Cosmic Post
ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ঢাকা |

তীব্র গরমে হাতপাখার চাহিদা আকাশছোঁয়া

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Apr 25, 2026 ইং
তীব্র গরমে হাতপাখার চাহিদা আকাশছোঁয়া ছবির ক্যাপশন:

তীব্র গরম আর ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে দেশজুড়ে আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে হাতে তৈরি তালপাখা। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে যখন ফ্যান ও অন্যান্য যন্ত্র অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের ভরসা হয়ে উঠছে এই প্রাচীন ও পরিবেশবান্ধব পণ্যটি। আর এই বাড়তি চাহিদার বড় অংশই পূরণ হচ্ছে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগর ইউনিয়নের হাঁপানিয়া ফকিরপাড়া গ্রাম থেকে।

নাটোর শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামটি তালগাছবিহীন হলেও দেশের কাছে পরিচিত “তালপাখার গ্রাম” হিসেবে। এখানে শতাধিক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে তালপাখা তৈরির সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে নারীরা এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন। সংসারের কাজের পাশাপাশি তারা বছরের প্রায় ছয় মাস তালপাখা তৈরি করে বাড়তি আয় করছেন।

গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই এখন ছোট ছোট কর্মশালার মতো পরিবেশ দেখা যায়। কোথাও তালপাতা কাটা হচ্ছে, কোথাও রোদে শুকানো হচ্ছে, আবার কোথাও বাঁশের কাঠি ও রঙিন খিল বসিয়ে পাখা তৈরির কাজ চলছে। নারী-পুরুষ সবাই মিলে দিন-রাত কাজ করেও বাজারের চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। অনেক সময় তৈরি হওয়া পাখা ঘরে পৌঁছানোর আগেই পাইকারদের কাছে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

কারিগররা জানান, তালপাখা তৈরির প্রধান কাঁচামাল তালপাতা ও ডাগুর প্রতি বছর পৌষ মাসের শুরুতে নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে সংগ্রহ করতে হয়। প্রতিটি তালপাতা কিনতে ২৫ থেকে ৩০ টাকা খরচ হয়। এরপর পাতাগুলো কেটে নির্দিষ্ট আকারে সাজিয়ে কয়েকদিন রোদে শুকানো হয়। শুকানোর পর বাঁশের কাঠি দিয়ে পাতাগুলো যুক্ত করে রঙিন নকশা ও সেলাইয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হয় চূড়ান্ত পণ্য।

একটি তালপাখা তৈরিতে কাঁচামালসহ মোট খরচ পড়ে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। পাইকারি বাজারে এটি বিক্রি হয় ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়, আর খুচরা বাজারে দাম ওঠে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। তবে শ্রমের তুলনায় আয় কম হওয়ায় অনেক কারিগরই কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

কারিগরদের মতে, গত বছর চাহিদা কম থাকায় তারা তুলনামূলকভাবে কম কাঁচামাল সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু চলতি বছরে হঠাৎ করেই তীব্র গরম ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। ফলে এখন কাঁচামাল সংকট এবং উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গ্রামের প্রবীণ কারিগর সাবেজান বেগম বলেন, তিনি বিয়ের পর থেকেই এই কাজ করছেন এবং এই আয় দিয়েই সন্তানদের বড় করেছেন। আগে চাহিদা কম ছিল, কিন্তু এখন গরম ও লোডশেডিংয়ের কারণে পাখার চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। যত তৈরি করা হচ্ছে, ততই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

আরেক কারিগর আলাউদ্দিন জানান, গত মৌসুমে চাহিদা কম থাকায় তারা কম কাঁচামাল এনেছিলেন। এবার হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দিন-রাত কাজ করেও বাজারের চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল যেমন ঢাকা, টাঙ্গাইল, খুলনা, পাবনা ও সিরাজগঞ্জে এই গ্রামের তালপাখা সরবরাহ করা হয়। তবে বর্তমানে চাহিদা বেশি থাকায় অনেক পাইকারই সময়মতো পণ্য পাচ্ছেন না।

অন্যদিকে শ্রমের তুলনায় মজুরি কম হওয়ায় অনেক নারী শ্রমিক কাঙ্ক্ষিত আয় পাচ্ছেন না। জানা গেছে, ১০০ পিস পাখা তৈরি করলে মজুরি পাওয়া যায় মাত্র ৮০০ টাকা। ৪ থেকে ৬ জন নারী একসঙ্গে কাজ করে দিনে প্রায় ২০০ পিস তৈরি করতে পারলেও পর্যাপ্ত কাঁচামাল না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান গোলাম রাব্বানী জানান, তালপাখা শিল্প এই অঞ্চলের একটি সম্ভাবনাময় খাত। কিন্তু পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা না থাকায় কারিগররা পিছিয়ে আছেন। সরকারি সহায়তা পেলে এই শিল্প আরও প্রসারিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সব মিলিয়ে গরম ও বিদ্যুৎ সংকটের এই সময়ে হাঁপানিয়া গ্রামের তালপাখা শিল্প একদিকে যেমন মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করছে, অন্যদিকে কারিগরদের জন্য তৈরি করেছে নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কসমিক ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
নাফ নদী ও স্থলপথে নজরদারি বাড়িয়েছে বিজিবি

নাফ নদী ও স্থলপথে নজরদারি বাড়িয়েছে বিজিবি