বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম জনপ্রিয় আয়োজন হলো পয়লা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়া। তবে চাঁদপুরে এবার সেই ঐতিহ্যে এসেছে বড় পরিবর্তন। ইলিশ সংরক্ষণ ও জাটকা রক্ষার কারণে জেলার বৈশাখী মেনুতে এবার পান্তা-ইলিশের পরিবর্তে ভিন্ন ধরনের দেশীয় মাছ ও ঐতিহ্যবাহী ভর্তার আয়োজন রাখা হয়েছে।
জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরেই ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মার্চ-এপ্রিল মাসে নদীতে জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এর ফলে এই সময়ে ইলিশ ধরা, বিক্রি, পরিবহন ও মজুদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফলে নববর্ষের উৎসবে ইলিশের উপস্থিতি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি সোহেল রুশদী জানান, একসময় পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার মাধ্যমে উৎসব শুরু হতো। কিন্তু এখন জাটকা সংরক্ষণে জেলার সব মহল সচেতন। তাই বর্তমানে পান্তার সাথে রুই, তেলাপিয়া, পুঁটি ও অন্যান্য দেশীয় মাছ যুক্ত করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও শুধুই ভর্তা ও শাকসবজি দিয়ে ঐতিহ্য রক্ষা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “পান্তা-ইলিশ নামটি থাকলেও বাস্তবে এখন আর ইলিশ ব্যবহার করা সম্ভব নয়। পরিবেশ ও মৎস্য সম্পদ রক্ষায় সবাই একমত হয়ে কাজ করছে।”
অন্যদিকে চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল বারি জমাদার মানিক বলেন, মার্চ ও এপ্রিল মাসে চাঁদপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশ কেনা-বেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পদ্মা-মেঘনা ও আশপাশের নদীগুলোতে এই সময়ে ইলিশ সংরক্ষণে কঠোর নজরদারি চালানো হয়।
তিনি আরও জানান, নিষেধাজ্ঞার আগে বড় আকারের ইলিশ কেজিপ্রতি ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হতো। কিন্তু এখন বাজারে ইলিশ না থাকায় পান্তার সাথে মানুষ দেশীয় মাছ যেমন রুই, পুঁটি, তেলাপিয়া ইত্যাদি বেশি কিনছে।
চাঁদপুর সদর উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে টাস্কফোর্স নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। নদী থেকে শুরু করে বাজার পর্যন্ত সব জায়গায় নজরদারি চলছে যাতে কেউ অবৈধভাবে ইলিশ বিক্রি করতে না পারে।
তিনি আরও বলেন, “যারা আইন ভঙ্গ করছে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত জেল-জরিমানার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাই বৈশাখে পান্তা-ইলিশের নামে প্রচলন থাকলেও বাস্তবে এখন তা আর কার্যকরভাবে নেই।”
স্থানীয়দের মতে, পান্তা-ইলিশের ঐতিহ্য কিছুটা পরিবর্তিত হলেও চাঁদপুরে বৈশাখী উৎসবের আনন্দ কমেনি। বরং দেশীয় খাবার ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে নতুন রূপে নববর্ষ উদযাপন হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইলিশ সংরক্ষণের এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে দেশের মৎস্য সম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একইসাথে স্থানীয় সংস্কৃতিও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।
সব মিলিয়ে চাঁদপুরে এবার পয়লা বৈশাখে পান্তা-ইলিশের পরিবর্তে ভিন্ন স্বাদের দেশীয় খাবারই হয়ে উঠেছে মূল আকর্ষণ।
কসমিক ডেস্ক