বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক চাপে নড়বড়ে অবস্থার মধ্যে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দুর্বল প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের ভগ্নদশা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সম্মিলিত প্রভাবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বুধবার ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। এতে সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, টানা তিন বছর ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হওয়ায় দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯ শতাংশে নামতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, কম রাজস্ব আদায় এবং বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলছে।
বিশেষ করে বৈশ্বিক সংঘাত পরিস্থিতি অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার ফলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়ছে, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এতে বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে চাপ তৈরি হচ্ছে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ব্যবসা পরিবেশের জটিলতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। উচ্চ ঋণব্যয় এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অর্থনীতির গতিশীলতা কমে যাচ্ছে।
রাজস্ব খাতেও চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট। প্রত্যাশার তুলনায় কম রাজস্ব আদায়ের কারণে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় সীমিত হয়ে পড়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়ায় বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে সরকারকে ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে, যা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রাপ্তি আরও সংকুচিত করছে।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮.৫ শতাংশ থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে তা প্রায় ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। এতে তাদের জীবনমানের ওপর চাপ বাড়ছে এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দারিদ্র্যের হারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ২০২২ সালে যেখানে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ, তা বেড়ে ২০২৫ সালে ২১.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই সময়ে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। ভবিষ্যতে বৈশ্বিক পরিস্থিতির অবনতি হলে আরও প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, মূলধন ঘাটতি এবং তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে গিয়ে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সরকারের ব্যয়ও বাড়ছে বিভিন্ন কারণে। জ্বালানি ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং ব্যাংক খাত পুনঃমূলধনীকরণের প্রয়োজনীয়তা সরকারি ব্যয়ের চাপ বাড়িয়েছে। ফলে আর্থিক পরিসর সংকুচিত হয়ে উন্নয়ন ব্যয় পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তবে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথও দেখিয়েছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখা, কার্যকর কর সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং ব্যাংক খাতের দ্রুত সংস্কার জরুরি। পাশাপাশি ব্যবসা পরিবেশ সহজীকরণ, নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অবকাঠামো ও জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া অর্থনীতিকে টেকসই পথে ফেরানো সম্ভব নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার অনেকটাই নির্ভর করছে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কার্যকারিতা এবং বাস্তবায়নের ওপর।
কসমিক ডেস্ক